মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৫ অপরাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
রমজানের কারণে এগিয়ে এলো অমর একুশে বইমেলা, শুরু হবে ৭ জানুয়ারি যুদ্ধের ময়দানে আমরা দেখিনি কে কোন ধর্মের মানুষ: প্রধানমন্ত্রী দুর্গোৎসবে যশোর ও নড়াইলে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করল এসআরবি-৬ পদত্যাগের নির্দেশ সংক্রান্ত খবর ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’, ঞ্জনের মধ্যেই ইশরাকের বার্তা সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, ব্যাখ্যা চাইল বাংলাদেশ জয়পুরহাটে অটোভ্যান ছিনতাই ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামিসহ ৪ জন গ্রেফতার জবিস্থ চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রকল্যাণের নেতৃত্বে জিসাদ-অনিক কক্সবাজারের রিসোর্টে আগুনে যশোরের একই পরিবারের ৪ জন নিহত ভারতের গোয়ালিয়রে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মন্দিরের ফটকে ট্রাকের ধাক্কা, নিহত ১২ ২৭১ রান তাড়া করতে নেমে ১৭২ রানেই অলআউট, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বড় হার টাইগারদের

বাবা-মায়ের ধৈর্য, ভালোবাসা আর মামার অনুপ্রেরণায় হামীমের স্বপ্নযাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭৭ মোট ভিউ

স্কুলে যাওয়ার কথা শুনলেই কান্না করত। ক্লাসে বসেও বলত, ‘ক্লাস করব না, বাসায় চলে যাব।’ চার বছর বয়সে শুরু হওয়া সেই কান্নাভেজা শিক্ষাজীবন আজ এনে দিয়েছে অসাধারণ সাফল্য। এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করেছে মো. মাহফুজ খান হামীম।

২০০৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর জন্ম নেয় হামীম। বাবা মো. সুমন খান, মা হাসি আক্তার। দুই ভাই-বোনের মধ্যে হামীম বড়। ছোট বোন আরিয়া মেহেজাবীন বর্তমানে নার্সারি শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।

হামীমের পরিবারের আদি নিবাস নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। তবে বাবা এস কিউ সেলসিয়াস লিঃ-এ চাকরি করার কারণে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকাকেন্দ্রিক জীবনযাপন করে আসছে। ফলে গ্রামের বাড়িতে থাকা হয়েছে খুবই কম। গ্রামের অনেক মানুষ হামীমকে সরাসরি না চিনলেও তার বাবাকে ভালোভাবেই চেনেন।

হামীম এমন একটি পরিবারে বেড়ে উঠেছে, যে পরিবার তাকে ছোটবেলা থেকেই কোনো কাজের বোঝা বইতে দেয়নি। পরিবারের মূল লক্ষ্য ছিল—সে যেন মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে পারে।

শুরুর কান্না, শুরুর সংগ্রাম

মাত্র চার বছর বয়সে, ২০১৪ সালে, গাজীপুরের জৈনা বাজারের এইচ.এ.কে একাডেমিতে প্লে শ্রেণিতে ভর্তি হয় হামীম। কিন্তু শিক্ষাজীবনের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না।

প্রতিদিন বাবা-মাকে তাকে কোলে-কাঁখে করে স্কুলে নিয়ে যেতে হতো। ক্লাসে বসেই শুরু হতো কান্নাকাটি—‘ক্লাস করব না, বাসায় চলে যাব।’

এমন অনেক দিন গেছে, যেদিন বাবা-মা অসীম ধৈর্য নিয়ে ছেলের পাশে ক্লাসরুমেই বসে থেকেছেন, যাতে সে ক্লাস ছেড়ে পালিয়ে না যায়। ছোট্ট হামীমকে স্কুলমুখী করতে বাবা-মায়ের সেই চেষ্টা ছিল এক ধরনের নীরব সংগ্রাম।

এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ান হামীমের ছোট মামা মো. আসাদুল আলমও। মাঝেমধ্যে বাসায় বেড়াতে এলে সকালবেলা নিজেই ভাগ্নেকে ঘুম থেকে তুলে স্কুলে নিয়ে যেতেন। কান্না থামাতে ক্লাসের ভেতরেই পাশে বসে থাকতেন। এরপর ক্লাস শেষে নিজ হাতে তাকে বাসায় ফিরিয়ে আনতেন।

 

আরও পড়ুন

 

ভালোবাসা, মমতা আর ধৈর্যের সেই দিনগুলোই ধীরে ধীরে তৈরি করে দেয় হামীমের শিক্ষাজীবনের ভিত্তি।

দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে বদলে যাওয়ার গল্প

সময় গড়াতে গড়াতে হামীম যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওঠে, তখন তার মধ্যে জন্ম নেয় নতুন এক আত্মবিশ্বাস। সে বুঝতে শুরু করে—পড়াশোনা ছাড়া সামনে এগিয়ে যাওয়ার উপায় নেই, নিজের ভবিষ্যৎ নিজেকেই গড়ে নিতে হবে।

সেই সময় থেকেই বদলে যেতে থাকে হামীমের জীবনের গতিপথ। শুরু হয় মনোযোগী পড়াশোনার নতুন অধ্যায়।

এরপর থেকে ক্লাসে তার রোল নম্বর সবসময় প্রথম পাঁচের মধ্যে থেকেছে। পাশাপাশি একাধিকবার বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফলাফলের মাধ্যমে বৃত্তিও অর্জন করেছে সে।

যাদের অবদানে আজকের হামীম

হামীমের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান বাবা-মায়ের বলে মনে করে সে। বাবা মো. সুমন খানের পরিশ্রম ও সততা ছোটবেলা থেকেই কাছ থেকে দেখেছে হামীম। সেখান থেকেই জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা পেয়েছে সে।

হামীমের ভাষায়, ‘বাবা-মায়ের জন্যই আজ আমি এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি।’

নানাবাড়ির প্রতিটি সদস্য—নানাভাই, নানু, বড় খালামনি ও মামাদের আদর-স্নেহে বেড়ে উঠেছে হামীম। বিশেষ করে ছোট মামা মো. আসাদুল আলমের অবদান সে কখনো ভুলতে পারবে না।

বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র এই মামা সবসময় ভাগ্নেকে বলতেন, ‘বাবা, মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো।’

মামার এই কথাটিই যেন বছরের পর বছর হামীমের পথচলার পাথেয় হয়ে থেকেছে।

বইয়ের বাইরেও এক জীবন

শুধু পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না হামীমের জীবন। বইয়ের ফাঁকে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা ছিল তার প্রিয় শখ। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও ছিল তার আগ্রহ।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়েও পরিবারের সবার সম্মিলিত সহযোগিতা, ভালোবাসা ও উৎসাহে সে এগিয়ে গেছে। পরিবারের কেউ তাকে পড়াশোনার বাইরে কোনো কাজের বোঝা চাপিয়ে দেয়নি। বরং স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ করে দিয়েছে।

গোল্ডেন এ প্লাস: স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করেছে মাহফুজ খান হামীম।

এই সাফল্যে বাবা-মায়ের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তবে হামীমের কাছে এটি শেষ গন্তব্য নয়; বরং আরও বড় স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ।

হামীমের জন্মের পরপরই তার বাবা সুমন খান ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন একটি গভীর ইচ্ছার কথা—ছেলে বড় হয়ে একদিন ডাক্তার হবে।

বাবার ডায়েরিতে লেখা সেই স্বপ্ন আজ হামীমের নিজের স্বপ্নেও পরিণত হয়েছে। এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ার পর এখন তার লক্ষ্য, ঢাকার একটি ভালো কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া। এরপর একদিন চিকিৎসক হয়ে বাবার সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চায় সে।

কান্না থেকে গোল্ডেন এ প্লাস

হামীমের গল্পটা শুধু একটি ভালো ফলাফলের গল্প নয়। এটি একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের ধৈর্য, ভালোবাসা, ত্যাগ ও বিশ্বাসের গল্প।

যে শিশু একসময় স্কুলে যেতে চাইত না, ক্লাসে বসে কাঁদত, বাবা-মাকে বলত বাসায় নিয়ে যেতে—সেই শিশুই আজ এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করেছে।

প্লে ক্লাসের সেই কান্নাভেজা প্রথম দিন থেকে আজকের সাফল্য পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন বাবা-মা, মামারা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা।

হামীমের নিজের ভাষায়, ‘আমার জীবনের প্রতিটি ধাপে বাবা-মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। এখন বাকি পথ চলার জন্য সবার দোয়া ও সহযোগিতা চাই।’

আজকের এই সাফল্য তাই শুধু একটি ফলাফল নয়; এটি হামীম ও তার পরিবারের দীর্ঘ স্বপ্নযাত্রার একটি মাইলফলক। সামনে আরও বড় পথ, আরও বড় স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের শেষ প্রান্তে একদিন সাদা অ্যাপ্রন পরে দাঁড়িয়ে বাবার ডায়েরিতে লেখা স্বপ্নটি পূরণ করবে হামীম—এটাই এখন তার প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন

আরো সংবাদ ...
কপিরাইটঃ ২০২৬ দৈনিক সংবাদ শিরোনাম এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Developed by Infix Digital