পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গৌরবের ২১ বছর পেরিয়ে ২২ বছরে পদার্পণ করেছে। ১৮৫৮ সালে ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথপরিক্রমা পেরিয়ে ২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। শিক্ষা, গবেষণা, আন্দোলন-সংগ্রাম ও নানা অর্জনের মধ্য দিয়ে দেশের উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
প্রতিবছর ২০ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদ্যাপন করা হয়। তবে এবার সরকারি ছুটি ও দুর্গাপূজার কারণে নির্ধারিত দিনের কয়েক দিন পর আগামী ২ নভেম্বর সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদ্যাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদদীন।
কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ের। ১৮৫৮ সালে ‘ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুল’ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৮৭২ সালে বলিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী তাঁর বাবার নামে প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখেন জগন্নাথ স্কুল। ১৮৮৪ সালে এটি দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ এবং ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হয়।
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় জগন্নাথ কলেজের স্নাতক পর্যায়ের সম্মান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কলেজটির ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং গ্রন্থাগারের বইপত্র ও সাময়িকী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে যায়। ২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৫’-এর মাধ্যমে জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধ ও আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে জগন্নাথ কলেজের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা কলেজটিতে হামলা চালায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিষ্ঠানটির প্রাঙ্গণে গণহত্যা চালানো হয়। এ যুদ্ধে কলেজের কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী শহীদ হন। যুদ্ধের সময় কলেজে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর সেখানে গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায় এবং কয়েক ট্রাক মানবকঙ্কাল উদ্ধার করা হয় বলে প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
স্বাধীনতার পরও নানা সংকট ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। ১৯৮২ সাল থেকে কলেজের ছাত্রাবাসগুলো দখলের চেষ্টা শুরু হয়। একপর্যায়ে অধিকাংশ হল বেদখল হয়ে যায়। এসব সংকটের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, শিক্ষা কার্যক্রম ও বিভিন্ন অর্জনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগের শিক্ষার্থী ইকরামুল হক সাজিদ এবং গণিত বিভাগের আহসান হাবিব তামিম শহীদ হন।
সীমিত ক্যাম্পাসে বিস্তৃত শিক্ষা কার্যক্রম
প্রতিষ্ঠার সময় প্রায় ১১ দশমিক ১১ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান আয়তন সাড়ে সাত একর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সীমিত জায়গার মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক, একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠাকালে চারটি অনুষদ ও ২২টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে সাতটি অনুষদ, ৩৮টি বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউট রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম সিরাজুল ইসলাম খান। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে এখানে প্রায় ১৮ হাজার ৮৪৩ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। তাঁদের পাঠদান ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন ৬৬৫ জন শিক্ষক। এমফিল ও পিএইচডি কার্যক্রমে ৪৬৫ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৩৮ জন ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস ও গবেষণার সুযোগ বাড়াতে রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও দুটি উন্মুক্ত গ্রন্থাগার। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে রয়েছে ৩১ হাজার ৩২৬টি বই। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য নিজস্ব ও ভাড়ায় নেওয়া বাসসহ মোট ৫৭টি বাস রয়েছে। ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় মিলনায়তন, মেডিকেল সেন্টার, কাউন্সেলিং সেন্টার, শরীরচর্চা শিক্ষা কেন্দ্র, ডে-কেয়ার সেন্টার ও দুটি আধুনিক ক্যাফেটেরিয়াসহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে।
আবাসন সংকট ও দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের প্রত্যাশা
দীর্ঘদিন ধরে আবাসন সংকট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান সমস্যা। এ সংকট নিরসনে কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় প্রায় ২০০ একর জমির ওপর দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালে শেষ হওয়ার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী জানিয়েছেন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
এ ছাড়া কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের বিপরীত পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সাত একর জমিতে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পুনরুদ্ধার করা ড. হাবিবুর রহমান হল ও বাণী ভবন হলের সংস্কার ও নির্মাণকাজও চলছে।
অন্যদিকে, ছাত্রীদের জন্য ১৬ তলাবিশিষ্ট নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হলে এক হাজার ২০০ আসনের ব্যবস্থা রয়েছে। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথ চুক্তির আওতায় ৯০০ ছাত্রের জন্য ১০ তলাবিশিষ্ট একটি অস্থায়ী হলও চালু রয়েছে।
‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ গড়ার প্রত্যয়
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদদীন বলেন, ‘দুই দশকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এখন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দের একটি ক্যাম্পাস। শিক্ষা ও গবেষণার উত্তরোত্তর উন্নতির মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে সেন্টার অব এক্সেলেন্স হিসেবে গড়ে তুলে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করাই আমাদের প্রতিজ্ঞা। সে লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষা ও গবেষণা, শিক্ষার্থীদের আবাসন ও দ্বিতীয় ক্যাম্পাস বাস্তবায়ন আমাদের অগ্রাধিকার। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় আমরা চেষ্টা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি টিম জগন্নাথ স্লোগানকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা কামনা করছি। নতুবা এত সংকট মোকাবিলা করা অনেক কঠিন।’
দেড় শতাব্দীর ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ ও আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস এবং উচ্চশিক্ষায় ক্রমবর্ধমান অবদান নিয়ে এগিয়ে চলেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। সীমিত ক্যাম্পাসের নানা সংকট কাটিয়ে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস বাস্তবায়ন, আবাসন সুবিধা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের মধ্য দিয়ে একটি উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্যতম প্রত্যাশা।