নাটোরের সিংড়া উপজেলার প্রাণকেন্দ্র থেকে প্রায় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে, বিস্তীর্ণ চলনবিলের বুকে হিজলী গ্রামের পাশে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী তিসিখালি। এই গ্রামের প্রধান আকর্ষণ প্রায় আড়াইশ বছরের ইতিহাস বহনকারী ঘাসি দেওয়ানের মাজার, যা স্থানীয়দের কাছে তিসিখালি মাজার নামেই অধিক পরিচিত।
বর্ষা মৌসুমে চারদিকের অথৈ পানির মাঝখানে মাজারটি যেন এক ভাসমান দ্বীপে পরিণত হয়। দূর থেকে শত শত নৌকার সারি, সবুজ কচুরিপানার বিস্তৃতি আর গাছগাছালিতে ঘেরা মাজারের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সহজেই দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। বর্ষাকালে নৌকাই এখানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্ত, দর্শনার্থী ও প্রকৃতিপ্রেমীরা নৌপথে ছুটে আসেন এই ঐতিহাসিক স্থানে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং চলনবিলের অপরূপ পরিবেশের সমন্বয়ে তিসিখালি এখন সিংড়ার অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
আড়াইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী তিসিখালি মেলা
ঘাসি দেওয়ানের মাজারকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী তিসিখালি মেলা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এ মেলার ইতিহাসও প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো। মেলাকে ঘিরে নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে।
মেলায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বসে শতাধিক দোকান। খেলনা, মাটির তৈজসপত্র, গৃহস্থালির সামগ্রী, মিষ্টান্ন, গ্রামীণ হস্তশিল্পসহ নানা ধরনের পণ্যের পসরায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। অনেকে মানত পূরণ, দোয়া ও জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মাজারে আসেন।
লোককথায় ঘাসি দেওয়ানের ইতিহাস
স্থানীয় জনশ্রুতি ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বড়পীর হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক নির্দেশে হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.) সুদূর আরব দেশ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চলনবিল অঞ্চলে আগমন করেন। যদিও তাঁর প্রকৃত নাম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না, তবে তিনি ‘ঘাসি দেওয়ান’ বা ‘ঘাসি বাবা’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত।
লোককথায় আছে, একসময় চলনবিল অঞ্চলে প্রচুর তিল (তিসি) চাষ হতো। একদিন ভাবাবিষ্ট অবস্থায় তিনি জমির মালিকের অনুমতি ছাড়াই একটি তিল মুখে দেন। পরে নিজের ভুল উপলব্ধি করে জমির মালিকের কাছে ক্ষমা চাইতে যান। জমির মালিক ছিলেন স্থানীয় ডাহিয়া গ্রামের এক ঘোষ পরিবারের সদস্য। তিনি শাস্তিস্বরূপ ঘাস কাটার নির্দেশ দেন। হজরত ঘাসি দেওয়ান (রহ.) বিনা আপত্তিতে দীর্ঘদিন সেই কাজ করেন। এরপর থেকেই লোকমুখে তাঁর নাম হয়ে যায় ‘ঘাসি দেওয়ান’।
পরবর্তীতে তাঁর আধ্যাত্মিকতা ও অলৌকিক ঘটনার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে জমির মালিকও তাঁর ভক্তে পরিণত হন। ধীরে ধীরে তিনি মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
পর্যটনের অপার সম্ভাবনা
চলনবিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্যবাহী মাজার এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির অনন্য সমন্বয় তিসিখালিকে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। বর্ষায় নৌভ্রমণ এবং শীতকালে বিলের ভিন্ন রূপ উপভোগ করতে প্রতিবছর অসংখ্য দর্শনার্থী এখানে আসেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাজারে আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের দানের অর্থ প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
তবে পর্যাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই সহজে এখানে পৌঁছাতে পারেন না। স্থানীয়দের দাবি, স্থায়ী সেতু, উন্নত সড়ক এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে তিসিখালি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ধর্মীয় ও পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হবে।
চামারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আশরাফুল সরদার বলেন,
“ঘাসি দেওয়ানের মাজার আমাদের সিংড়া উপজেলার ঐতিহ্য ও গর্ব। প্রায় আড়াইশ বছর ধরে এখানে তিসিখালি মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর লাখো মানুষের সমাগম হয়। সরকার যদি স্থায়ী সেতু ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলে, তাহলে এটি শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, চলনবিলভিত্তিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হবে।”
বর্তমানে তিসিখালির ঘাসি দেওয়ানের মাজার শুধু একটি ধর্মীয় স্থানই নয়, বরং ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং চলনবিলের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য মিলনস্থল হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করছে। বর্ষার বুকে ভাসমান এই ঐতিহ্যবাহী মাজার আজও বহন করে চলেছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের অগাধ বিশ্বাসের অমূল্য স্মারক।