মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৯ অপরাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
রমজানের কারণে এগিয়ে এলো অমর একুশে বইমেলা, শুরু হবে ৭ জানুয়ারি যুদ্ধের ময়দানে আমরা দেখিনি কে কোন ধর্মের মানুষ: প্রধানমন্ত্রী দুর্গোৎসবে যশোর ও নড়াইলে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করল এসআরবি-৬ পদত্যাগের নির্দেশ সংক্রান্ত খবর ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’, ঞ্জনের মধ্যেই ইশরাকের বার্তা সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, ব্যাখ্যা চাইল বাংলাদেশ জয়পুরহাটে অটোভ্যান ছিনতাই ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামিসহ ৪ জন গ্রেফতার জবিস্থ চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রকল্যাণের নেতৃত্বে জিসাদ-অনিক কক্সবাজারের রিসোর্টে আগুনে যশোরের একই পরিবারের ৪ জন নিহত ভারতের গোয়ালিয়রে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মন্দিরের ফটকে ট্রাকের ধাক্কা, নিহত ১২ ২৭১ রান তাড়া করতে নেমে ১৭২ রানেই অলআউট, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বড় হার টাইগারদের

জুলাই রাজপথের সেই দিনগুলো: জবি ছাত্রদলনেতা পরাগের জুলাই স্মৃতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৯৩ মোট ভিউ

জীবনের কিছু দিন কখনো পুরোনো হয় না। সময়ের সঙ্গে ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়, কিন্তু কিছু মুহূর্ত বুকের ভেতর রক্তের দাগ হয়ে থেকে যায়। আমার কাছে ২০২৪ সালের জুলাই ঠিক তেমনই একটি সময়। সেই জুলাই শুধু একটি আন্দোলনের মাস নয়; এটি ছিল ভয়কে পরাজিত করার, বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকার এবং একটি স্বপ্নের জন্য জীবন বাজি রাখার মাস।

 

আমার রাজনৈতিক পথচলা আজকের নয়। কৈশোরেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে পরিচয়। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর রাজনীতি আমার কাছে কোনো পদ-পদবির বিষয় ছিল না; এটি ছিল বিশ্বাসের জায়গা। সেই বিশ্বাসের কারণেই বছরের পর বছর মামলা, হামলা, গ্রেপ্তারের ভয় এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠনের সঙ্গে থেকেছি।

 

জুলাইয়ের শুরুতে যখন কোটা আন্দোলন ধীরে ধীরে গণআন্দোলনের রূপ নিচ্ছিল, তখন আমরা বুঝতে পারছিলাম দেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের সময় সামনে আসছে। প্রকাশ্যে সব জায়গায় থাকা তখন আমাদের পক্ষে সহজ ছিল না। তবুও আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বড় হবে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি। তাই শুরু থেকেই আমরা নৈতিক, সাংগঠনিক এবং মানবিকভাবে আন্দোলনের পাশে দাঁড়াই।

 

জিরো পয়েন্টের বাংলা ব্লকেডে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, আন্দোলন শুধু স্লোগান দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে এক বোতল পানি, এক প্যাকেট স্যালাইন আর একজন সহযোদ্ধার কাঁধে হাত রাখার মধ্য দিয়ে। রাজপথে দাঁড়িয়ে যখন দেখেছি ক্লান্ত একজন শিক্ষার্থী আবার নতুন করে স্লোগান দিচ্ছে, তখন মনে হয়েছে, এই দেশের ভবিষ্যৎ এখনো বেঁচে আছে।

 

১১ জুলাই আমার স্মৃতিতে বিশেষভাবে গেঁথে আছে। সেদিন অনেকেই দ্বিধায় ছিলেন। কেউ আন্দোলন থেকে সরে যেতে চাইছিলেন, কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। সেই মুহূর্তে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, ঐক্য ভেঙে গেলে আন্দোলনও ভেঙে যাবে। তাই সহযোদ্ধাদের নিয়ে আমরা এগিয়ে যাই। ব্যারিকেড অতিক্রম করে শাহবাগ পর্যন্ত পৌঁছানোর সেই যাত্রা ছিল শুধু একটি রাস্তা পার হওয়া নয়; ছিল ভয়কে অতিক্রম করার প্রতীক।

 

১৬ জুলাইয়ের কথা মনে পড়লে আজও বুক ভার হয়ে আসে। চারদিকে গুলির শব্দ, দৌড়, চিৎকার, আহত মানুষের আর্তনাদ সবকিছু যেন যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য। সহযোদ্ধাদের গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছি। এইদিন পুরান ঢাকায় আহত হন আতিক, ফেরদৌস শেখ,নাসিম,অনিক, ফয়সাল কামাল সহ অসংখ্য সহযোদ্ধা।কেউ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, কেউ হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সাহায্য চাইছে। সেদিন রাজনীতি নয়, মানুষের জীবনই ছিল সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। একজনকে কাঁধে তুলে হাসপাতালে নেওয়ার সময় মনে হয়েছিল, আমরা হয়তো সবাই ফিরে যেতে পারব না; তবু কাউকে ফেলে রাখা যাবে না।

 

১৭ জুলাই গায়েবানা জানাজায় অংশ নিতে গিয়ে বাইতুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের আশে পাশে গ্রেপ্তারের মহোৎসব শুরু হয় ।সুমন ভাই সামনে থেকে গ্রেফতার হলেও আমি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সুজন মোল্লা ভাই সহ অনেকেই অল্পের জন্য রক্ষা পাই। কিন্তু ভয় তখন আর আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, এত দূর এসে পেছনে ফেরার সুযোগ নেই।

 

১৮ ও ১৯ জুলাই রাজধানীর রাজপথ যেন এক বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। কোথাও মিছিল, কোথাও ধাওয়া, কোথাও টিয়ারশেল, কোথাও গুলির শব্দ। প্রেস ক্লাবমুখী মানুষের স্রোত, পুরানা পল্টনের উত্তেজনা, সহযোদ্ধাদের মৃত্যু সবকিছু খুব কাছ থেকে দেখেছি।১৯ তারিখ জুম্মার নামাজের পর রাজপথে নিজের সর্বোচ্চটুকু উজাড় করে দিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন সুজন ভাই। মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত হতে পারে, সেই শিক্ষা আমি সেদিন পেয়েছি।

 

জুলাইয়ের শেষদিকে অনেকেই মনে করেছিলেন আন্দোলন হয়তো থেমে যাবে। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শক্তি কখনো অস্ত্র নয়, মানুষের আশা।তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তার তারেক রহমান এর তত্ত্বাবধানে আমরা আবার সহযোদ্ধাদের একত্রিত করি, মনোবল ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি। বিশ্বাস ছিল, মানুষ যদি একবার জেগে ওঠে, তাকে দীর্ঘদিন থামিয়ে রাখা যায় না।

 

আগস্টের শুরুতে শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে যখন এক দফার দাবিতে মানুষ এক কাতারে দাঁড়াল, তখন মনে হয়েছিল দীর্ঘদিনের ভয়, ক্ষোভ আর বঞ্চনা এক জায়গায় এসে মিলেছে। হাজারো মানুষের সেই দৃঢ়তা আমাকে নতুন করে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মানুষের পক্ষেই দাঁড়ায়।

 

আজ যখন সেই দিনগুলোর কথা মনে করি, তখন কোনো পদ বা পরিচয়ের কথা ভাবি না। মনে পড়ে শুধু রাজপথে ছুটে চলা অসংখ্য মুখ, আহত সহযোদ্ধার চোখ, ক্লান্ত শিক্ষার্থীর কণ্ঠ, আর দেশের জন্য কিছু করার এক অদম্য ইচ্ছা।

 

আমরা যারা সেই সময় রাজপথে ছিলাম, প্রত্যেকের গল্প আলাদা। কেউ ফিরে এসেছে, কেউ চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। ইতিহাস হয়তো সবার নাম মনে রাখবে না, কিন্তু প্রতিটি ত্যাগই এই দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার অংশ হয়ে থাকবে।

 

আমার বিশ্বাস, রাজনীতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের পাশে দাঁড়ায়। জুলাই আমাকে সেই শিক্ষাই দিয়েছে। তাই আজও মনে করি, ক্ষমতা নয়, মানুষের আস্থা অর্জনই একজন রাজনৈতিক কর্মীর সবচেয়ে বড় অর্জন। রাজপথের সেই দিনগুলো আমার কাছে কোনো স্মৃতি নয়; এগুলো আমার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় দায়, সবচেয়ে বড় প্রেরণা এবং সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

 

লেখক: সাখাওয়াতুল ইসলাম খান পরাগ

যুগ্ম-আহ্বায়ক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল।

শেয়ার করুন

আরো সংবাদ ...
কপিরাইটঃ ২০২৬ দৈনিক সংবাদ শিরোনাম এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Developed by Infix Digital